ইরাবতীর গল্প।। বাংলা কষ্টের গল্প।

ইরাবতি

লেখক : কেয়া_চক্রবর্তী

ইরাবতীর গল্প।। বাংলা কষ্টের গল্প।



এক কাপ মত সাদা ভাত,সামান্য আলু ভর্তা,ডিম,হাফ চামচ ঘি,এক পিস ইলিশ মাছ,আর হাফ কাপ মত মাটন বিরিয়ানি ইরার সামনে সাজিয়ে রাখেন ইরার মা।খাবার দেখে ইরার চোখে পানি চলে আসে।তার মা তার প্রিয় প্রিয় খাবার গুলোই এনেছেন।তবে খুব অল্প তেলে রান্না করে আর খুব অল্প পরিমাণে।ইরার মনে হতে থাকে আজ জীবনের শেষ খাবার খাচ্ছে সে।কাল সার্জারি। আজ সন্ধ্যার পর থেকে সে আর কিছুই খেতে পারবেনা,এমনকি পানিও নয়।তাই তার বাবা মা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন তার পছন্দের খাবারগুলো খাওয়াতে।
ইরার মা ভাত মেখে ইরাকে খাইয়ে দিতে থাকেন।ইরা অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে।ভাতের গ্রাস তার গলায় আটকে যেতে চাইছে।অনেকদিন পর ইরা তার মায়ের হাতে খাচ্ছে।ইরার কিছুদিন আগে খুব ইচ্ছে হয়েছিল একদিন সে আরাম করে বসে তার মায়ের হাতে খাবে।এখন ইরার মনে হচ্ছে তার মা তার সেই ইচ্ছের কথা দৈবভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।আজ ইরার সবগুলো ইচ্ছে যেন একসাথে পূরণ হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সেগুলো যে এভাবে পূরণ হবে তা সে কখনো ভাবেনি।
ইরার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়।ইরার মা চাকরিজীবী। তাই ইরাকে সেভাবে সময় দিতে পারেননি।কাজের বুয়ার হাতেই ইরা বড় হয়েছে।সকালে ইরার মা অফিস যাওয়ার আগে কাজের বুয়া ইরার মাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ইরাকে ভাত খাইয়ে দিত।কিন্তু দুপুরবেলা ডাল দিয়ে ভাত মেখে দিয়ে ইরাকে ড্রয়িং রুমের সেন্টার টেবিলে বসিয়ে দিয়ে নিজে সোফার উপর পা তুলে বসে দিব্যি সিনেমা দেখত।ইরা ভাতগুলো নাড়তে নাড়তে বলত- "আন্টি, একটু কার্টুন দেন না।"
বুয়া বলত- "আম্মাজান, আমি সিনেমা দেখতাছি।এহন কার্টুন দিবার পারতাম না।আপনি ভাত খান,নাইলে আপনার আম্মা আমারে বকব।"ইরা নেড়েচেড়ে কয়েক গ্রাস খেয়ে উঠে পড়ত।আর বাকি ভাতগুলো টিভি দেখতে দেখতে বুয়াই খেয়ে ফেলত।প্রতিদিন দুপুরে ইরার মা ফোন করে ইরা খেয়েছে কিনা জানতে চাইত।আর বুয়া খেয়েছে বলে তাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিত।ইরা সব দেখেও চুপ করে থাকত।তখন ইরার কতই বা বয়স? এই ৫/৬ মত হবে।সেই বয়সেই তার মা শিখিয়ে দিয়েছিল কারো সম্পর্কে অযথা নালিশ না করতে।আর বুয়ারাও মানুষ। তাদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে।কিন্তু ইরা বেচারি অন্যায়ের নালিশ আর অযথা নালিশের পার্থক্য তখনো করতে শিখেনি।
আজ এতগুলো বছর পর তার সেই বুয়ার কথা মনে পড়ে গেল।মনে মনে সেই বুয়াকে ক্ষমা করে দিল।বুয়া ইরাকে খুব ভালবাসত,ইরা তা বুঝতে পারত।কিন্তু টিভি দেখার জন্য কাজে ফাঁকি দিত শুধু।ইরা সব খাবার থেকে অল্প অল্প করে খায়। খাওয়া শেষ হলে ইরার মা বলেন- "আয় মা...চুলটা আঁচড়ে দিই।" ইরার মা অনেক যত্ন করে আলতোভাবে ইরার চুল আঁচড়ে দিলেন।এরপর ইরাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ইরার ভাইকে রেখে আবার বাড়ি চলে গেলেন।ভাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে ইরা কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা সে টেরই পায়নি। ঘুম ভাঙ্গলে ইরা তার মা আর ভাইকে দেখতে পায়।
ভাই বলে- " মা তোর জন্য কি এনেছে দ্যাখ! "
ইরা-" কি?"
ইরার ভাই- গেস করত কি? তোর প্রিয় স্ন্যাক্স আর ডেজার্ট।
ইরা- "নুডলস আর পুডিং?
ইরার ভাই- "গুড!ভেরি গুড!বলেছিলাম না মা? তোমার মেয়ে তোমাকে বলেনি,কিন্তু ঠিকই নুডলস আর পুডিং এর জন্য ঘাপটি মেরে বসে আছে!"
ইরা জোর করে হাসার চেষ্টা করে।মার হাতের পুডিং ইরার খুব ফেভারিট। কিন্তু মা নুডলস কখনো ইরার মনমত বানাতে পারেননি।তাই ইরা নিজেই নিজের নুডলস রান্না করে।নুডলস এর ব্যাপারে সে খুব খুঁতখুঁতে। ইরার মা এক চামচ নুডলস নিয়ে ইরার দিকে এগিয়ে দেয়।মায়ের নুডলস এর প্রতি ইরার কোন ভরসা নেই।তবুও সে খাওয়ার জন্য মুখটা এগিয়ে দেয়।কিন্তু এক চামচেই ইরার ধারণা পাল্টে যায়।এত টেস্টি নুডলস সে কোনদিনও খায়নি।কিভাবে কি হচ্ছে সে বুঝে উঠতে পারেনা।সে কয়েক চামচ খেয়ে আর খেতে পারেনা।
ইরার মা বলে- " কিরে মা?ভাল হয়নি,না?
ইরা-" না, মা... খুব ভাল হয়েছে।সত্যি বলতে এত ভাল নুডলস আমি জীবনে খাইনি।কথাগুলো বলতে গিয়ে ইরার কন্ঠ ধরে যায়।"
ইরার মা এরপর পুডিং টা খাইয়ে দেন।ইরা ভাবতে থাকে এটাই হয়ত তার জীবনের শেষ খাওয়া।তার মন বলছে এই সার্জারিটা সাকসেসফুল হবেনা। সন্ধ্যা থেকে ইরাকে কড়া অবজারবেশনে রাখা হয়েছে।আগামীকাল সকাল ৬ টায় সার্জারি। তাই আজ সন্ধ্যা ৬ টা থেকে কিছু খাওয়া যাবেনা।এম্পটি স্টোমাকে থাকতে হবে।এমনকি পানিও না।শুধু ওষুধ খেতে যতটুকু পানি লাগে ততটুকুই।তার একটু বেশি ও না, কম ও না। পারমিশন নিয়ে ইরার মা রাতে ইরার সাথে থেকে যায়।সারারাত তিনি ঘুমাননি।
পরদিন সকালে ইরাকে অপারেশন টেবিলে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।সেখানে যাওয়ার আগে ইরা বাবা মাকে সালাম করল।ভাইকে জড়িয়ে ধরে আদর করল।বাবা আর মাকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে কাঁদল। ইরার বারবার মনে হচ্ছিল এই মানুষগুলোর কাছে সে আর কোনদিন ফিরতে পারবেনা। সকাল ৬ টায় ইরাকে অপারেশন টেবিলে নেয়া হয়।অপারেশন টেবিলে শুয়ে সেন্সলেস করার আগে ইরা তার কাছের ও দূরের যেসব মানুষের সাথে তার মান অভিমান কিংবা রাগ ছিল তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেয়।প্রায় বিকেল ৩ টা পর্যন্ত অপারেশন চলে।অপারেশনের পর ইরার বাবা মা ভাই ডাক্তারের কাছে ছুটে যায়।কিন্তু ডাক্তার তখনো কিছু বলতে পারেনা।ইরাকে আইসিইউ তে রাখা হয়।
সেদিন তার বাবা মা ভাই ছটফট করতে থাকে ডক্টর এর কাছ থেকে ভাল কিছু শোনার আশায়।কিন্তু ইরার জ্ঞান ফেরেনা।ইরার বাবা মা পাগলের মত হয়ে যায়।দ্বিতীয় দিন রাত দুইটার দিকে নার্স এসে তাড়াতাড়ি ইরার বাবা মা আর ভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। আর বলে যে,পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু কি যেন বলতে চাইছে। সবাই আইসিইউর দিকে ছুটে যায়।আর দেখে যে ইরা কি যেন বলতে চাইছে আর বলতে না পেরে ছটফট করছে।ডক্টরদের কেমন অস্থির দেখাচ্ছে। তারা ইরাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর একে অন্যের সাথে ডাক্তারি ভাষায় কথা বলছে।যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। ইরাকে দেখে মনে হচ্ছিল ওর অবস্থা ভালনা। বাবা মা ভাই ইরার হাত ধরে রাখে।
ইরার কাছে তার প্রিয় মুখগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। সে শুনতে পায়- তার মা বলছে - "মা তোর জন্য বিরিয়ানি রান্না করেছি।খাইয়ে দিব আয়"
বাবা বলছে- "আইসক্রিম খাবি মা? কোন ফ্লেভারের খাবি বল।টুটি ফ্রুটি? স্ট্রবেরি?নাকি অন্য কিছু?কোন ধরণের খাবি?কোণ? চকোবার? নাকি কাপ?"
ভাই বলছে-" আপি... আমাকে কিছু টাকা দে না... ফ্রেন্ডসদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাব।কথা দিচ্ছি টাকা বাঁচলে তোর জন্য নুডলস নিয়ে আসব।"
একবারের জন্য সে পাইলট ছেলেটাকেও দেখল।সে বলছে- "ইরা... আমিও তোমাকে ভালবাসি।খুব ভালবাসি।বিশ্বাস কর।কখনো বলতে পারিনি।আজ বলছি।ফেসবুকে আমি ও তোমাকে অনেক খুঁজেছি।কিন্তু তোমাকে খুঁজে পাইনি।ইশ!একবার যদি পেতাম!...আমাকে ছেড়ে যেওনা ইরা..."
অনেক বছর হয়ে গেছে। আজ ইরার মৃত্যুবার্ষিকী। অদ্ভুত নিয়মে আজ ইরার জন্মবার্ষিকী ও।সে তার জন্মদিনেই মারা যায়।ইরার মা দুপুরে ঝরঝরে সাদা ভাত,আলু ভর্তা, ডিম ভাজা, এক টেবিল চামচ ঘি, ইলিশ মাছ, মাটন বিরিয়ানি আর মাটন রেজালা টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন।সব খাবার সাজিয়ে তিনি এমনভাবে বসে আছেন যেন ইরা এক্ষুণি চলে আসবে খেতে।আর তার প্রিয় খাবারগুলো দেখে মার গলা জড়িয়ে আদর করে, চুমু খেয়ে চোখ টিপে বলবে...প্রতিদিন আমার জন্মদিন পালন করলে কিন্তু বেশ হয়! কি বল???তারপর চেয়ারে পা তুলে বসে বলবে, আমার হাত ব্যাথা করছে,আমাকে খাইয়ে দিতে হবে কিন্তু!"
ইরার মা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন।
ইরার ভাই রেস্টুরেন্ট থেকে নুডলস আর পুডিং নিয়ে এসেছে।কিন্তু সে ইরার রুমে সেগুলো হাতে নিয়েই বসে আছে। তার মনে হচ্ছে কোন এক দৈবশক্তিতে ইরা হয়ত এখন চলে আসবে আর এসেই বলবে- "এই যে!আমার পকেট কেটে আমার জন্মদিন সেলিব্রেট করা হচ্ছে?আমি কিছু বুঝিনা,না? যেদিন নিজের টাকা দিয়ে সেলিব্রেট করবি সেদিন এত কম খরচে কাজ সারবনা কিন্তু বলে দিলাম! এখন নিজের টাকা বলে কথা.. তাই মায়া লাগে! আর এগুলো সব আমি একা খাব? আমাকে কি তোর ড্রামের মত লাগে? আয়... শেয়ার কর..." কিছুক্ষণ পর ইরার বাবা কয়েক রকম আইসক্রিম নিয়ে আসেন।তারপর আনমনেই বলেন- "ইরা মা...তোর জন্য কি এনেছি দ্যাখ!" তিনি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন ইরা বলছে-" বাবা! আইসক্রিম!" তারপর বাবার গলা জড়িয়ে বলছে- "তুমি এত্তগুলা ভাল বাবা...উম্মাহ..."
ইরার বাবার চোখ ভিজে যায়।তিনি বুঝতে পারেন এসবই তাঁর ভাবনা।তিনি তাড়াতাড়ি আইসক্রিম গুলো ইরার পড়ার টেবিলে রেখে দিয়ে চলে যান।ইরার ভাই একদৃষ্টিতে আইসক্রিমগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।ইরার কাছে টাকার বায়না করা,ইরাকে নিয়ে মিমিক্রি করে মারামারি করা এসব সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। এসব ভাবতে ভাবতে যে কতক্ষণ কেটে গেছে সে টের ও পায়না। তার চোখ ভিজে গিয়ে সবকিছু ঝাপসা দেখছে।
ঝাপসা চোখেও সে দেখতে পাচ্ছে একদল পিঁপড়ে স্টাডি টেবিলে উঠছে আর একদল পিঁপড়ে নামছে।পিঁপড়েসারি দেখে সে অস্থির হয়ে তাড়াতাড়ি উঠে কাছে গিয়ে দেখতে পায়- ইরার জন্য বাবার রেখে যাওয়া আইসক্রিম গলে পড়ে আছে...

3 Comments

  1. Kharap lagar valo laga!!!
    lekhok ke dhonnobad.

    ReplyDelete
    Replies
    1. সাথে থাকুন। ধন্যবাদ!!

      Delete
  2. নতুন নতুন গল্প ও জোকস পেতে ভিজিট করতে পারেন আমার সাইটে
    www.valobasargolpo2.xyz

    ReplyDelete
Previous Post Next Post